শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভুট্টা-মরিচ আবাদের মৌসুমে সারসংকট, ৫ বিঘার বদলে ২ বিঘায় চাষ, দুশ্চিন্তায় চরাঞ্চলের কৃষক

ভুট্টা ও মরিচ চাষের মৌসুম শুরু হতেই গাইবান্ধার চরাঞ্চলে দেখা দিয়েছে সারের সংকট। দীর্ঘ নদীপথ পাড়ি দিয়ে সার ডিলারের কাছে গিয়েও চাহিদা অনুযায়ী সার পাচ্ছেন না কৃষকরা। চরাঞ্চলে খুচরা সার বিক্রির কেন্দ্র চালু করা হলেও সংকটের সমাধান হয়নি বলে অভিযোগ তাঁদের। সময়মতো সার না পেয়ে ভুট্টা ও মরিচের আবাদ নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। তাঁদের আশঙ্কা, সময়মতো জমিতে সার প্রয়োগ করতে না পারলে ফসলের বৃদ্ধি ও উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে।

প্রতিবছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করে কৃষির মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির স্বপ্ন দেখেন গাইবান্ধার চরাঞ্চলের কৃষকরা। রবি মৌসুমে এসব চরে ভুট্টা, মরিচসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ করেন তাঁরা। এ বছরও ভুট্টা ও মরিচ চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। তবে মৌসুমের শুরুতেই সারের সংকট দেখা দেওয়ায় তাঁদের সেই ব্যস্ততার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাড়তি দুশ্চিন্তা।

কৃষকদের অভিযোগ, ডিলারদের কাছে চাহিদা অনুযায়ী সার পাওয়া যাচ্ছে না। চরাঞ্চলের কৃষকদের কাছে দ্রুত সার পৌঁছে দিতে কৃষি বিভাগ সাব-ডিলার নিয়োগ করলেও প্রয়োজনীয় সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ফলে অনেক কৃষক জমি প্রস্তুত করেও সারের অপেক্ষায় রয়েছেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, গাইবান্ধার বিভিন্ন চরাঞ্চলে কেউ ভুট্টা ও মরিচ চাষের জন্য জমি প্রস্তুত করছেন, আবার কেউ ইতোমধ্যে চাষাবাদ শুরু করেছেন। অনেকে জমি তৈরি করে সার সংগ্রহের অপেক্ষায় রয়েছেন। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পরপরই যেসব জমিতে ভুট্টা লাগানো হয়েছে, সেসব জমিতে সবুজ চারাগাছ বাতাসে দুলছে। কৃষক-কৃষাণিদের এখন দম ফেলার সময় নেই। তবে সারের সংকট তাঁদের কৃষিকাজে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কৃষকদের দাবি, ভুট্টা ও মরিচ চাষের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রয়োজনীয় সার না পাওয়ায় উৎপাদন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। চরাঞ্চল থেকে ডিলারের বিক্রয়কেন্দ্রে গিয়ে সার সংগ্রহ করতে অতিরিক্ত সময় ও পরিবহন খরচ বাবদ তিন থেকে চারশ টাকা বেশি ব্যয় হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনের তুলনায় কম সার পাওয়ায় বাধ্য হয়ে অন্য জায়গা থেকে বেশি দামে সার সংগ্রহের চেষ্টা করছেন তাঁরা। এ পরিস্থিতিতে কৃষকদের ভোগান্তি কমাতে খোলাবাজারে সার বিক্রির ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

গাইবান্ধা জেলার ফুলছড়ি উপজেলার চর কাবিলপুর রেজাউল নিয়ে জানান যেখানে আমি ৫ বিঘা আবাদ করতাম সেখানে সার সংকট কারণে আবাদ করতেছি ২ বিঘা।

ফুলছড়ি উপজেলার ফজলুপুর ইউনিয়নের উজলডাঙা গ্রামের কৃষক আল আমিন বলেন, ভুট্টা চাষের ভরা মৌসুমে ইউরিয়া সার পাচ্ছি না। ডিলারের কাছে গেলে সামান্য পরিমাণ সার দেওয়া হচ্ছে। তা দিয়ে জমির চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। বাধ্য হয়ে অন্য জায়গা থেকে বস্তাপ্রতি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি দিয়ে সার সংগ্রহ করে জমিতে দিতে হচ্ছে।

ফুলছড়ির গুপ্তমনির চরের কৃষক সবুজ মিয়া বলেন, জমিতে ভুট্টা লাগাচ্ছি। এ বছর সারের যে সংকট, তাতে ভুট্টার ফলন নিয়ে চিন্তায় আছি। ডিলারের পাশাপাশি খোলাবাজারে সার বিক্রির ব্যবস্থা করা হলে কৃষকদের সুবিধা হতো।

আরেক কৃষক সামাদ মিয়া বলেন, “সারের জন্য ডিলারের কাছে গেলে বিএএসের কাছে যেতে বলে। আবার বিএএসের কাছে গেলে কৃষি কর্মকর্তার কাছে যেতে বলে। এভাবে সারের জন্য হয়রানির শিকার হচ্ছি। জমিতে পানি দিয়েছি, এখন সার নেই। সঠিক সময়ে সার দিতে না পারলে ভুট্টার গাছ লাল হয়ে মারা যেতে পারে। এতে আমাদের বড় ধরনের ক্ষতি হবে।”

এরেন্ডাবাড়ীর কৃষক আবু হাসনাত বলেন, “আমি ৩৫ বিঘা জমিতে ভুট্টা চাষ করছি। জমিতে পানি দেওয়া ও নিড়ানি দেওয়ার পর সার প্রয়োগ করতে হবে। কিন্তু প্রয়োজনীয় সার পাচ্ছি না। ডিলার মাত্র দুই বস্তা সার দিয়েছেন। এই সামান্য সার দিয়ে এত জমির চাহিদা পূরণ হবে না। কষ্ট করে আবাদ করছি, সারের অভাবে তা নষ্ট হতে দিতে চাই না। তাই বেশি দাম দিয়ে হলেও অন্য জায়গা থেকে সার সংগ্রহের চেষ্টা করছি।”

মোল্লার চরের কৃষক ময়নুল প্রামাণিক বলেন, “চরের মানুষের এখন আবাদ করার ভরা মৌসুম। আমাদের পর্যাপ্ত সার দরকার, কিন্তু সার পাচ্ছি না। আমরা ডিলার, মিলার নাকি কৃষি কর্মকর্তার কাছে যাব, তা বুঝতে পারছি না। বেশি দাম দিয়ে হলেও যেন দোকান থেকে সার কেনার ব্যবস্থা করে দেয় সরকার। আবাদ না হলে আমরা বাঁচব কীভাবে।

সুন্দরগঞ্জের লাল চামার চরের কৃষক আইজার আলী বলেন, ভুট্টা আবাদে পর্যাপ্ত ইউরিয়া সার প্রয়োজন। কিন্তু প্রয়োজন অনুযায়ী সার পাচ্ছি না। সার না পেলে আবাদ করব কীভাবে? আমাদের সংসার চলে কৃষিকাজের ওপর। খোলাবাজারে সার বিক্রির ব্যবস্থা থাকলে কৃষকদের এত হয়রানির শিকার হতে হতো না।”

এ বিষয়ে ফুলছড়ির পুরাতন ফুলছড়ি এলাকার বিসিআই অনুমোদিত রাসায়নিক সার ডিলার মো. মিজানুর রহমান বলেন, “সরকারিভাবে মাসে যে পরিমাণ সার বরাদ্দ পাই, তা কৃষকদের মধ্যে বিক্রি করি। সার শেষ হয়ে গেলে চাইলেও আর দেওয়া সম্ভব হয় না। চরাঞ্চলের ভুট্টাচাষিদের একই সময়ে সারের চাহিদা থাকায় এ সমস্যা তৈরি হচ্ছে। আমরা মাসে যতটুকু বরাদ্দ পাই, ততটুকুই কৃষকদের কাছে বিক্রি করি।

স্থানীয়দের কাছে গাইবান্ধার চরাঞ্চল পরিচিত ‘হিট অ্যান্ড ডায়মন্ড’ হিসেবে। একসময় এসব জমির অনেকটাই পতিত পড়ে থাকত। এখন রবি মৌসুমে এসব জমিতে উৎপাদিত ভুট্টা স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। ভুট্টা ও মরিচসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ চরাঞ্চলের কৃষকদের জীবিকার অন্যতম উৎস।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে গাইবান্ধা জেলার ছোট-বড় ১৬৫টি চরেসহ জেলায় মোট ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে ভুট্টা চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং ১ হাজার ৯শ ৫৬ হেক্টর জমিতে মরিচ চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ।

গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক মো. আসাদুজ্জামান বলেন, “প্রতিবছর নভেম্বরের দিকে চরাঞ্চলে ভুট্টা চাষ শুরু হয়। এ বছর আগাম বন্যার কারণে অক্টোবরের শুরুতেই কৃষকরা ভুট্টা লাগানো শুরু করেছেন। এ ছাড়া কৃষকরা চাহিদার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি সার আগাম সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। তবে গুদামে পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে। পর্যায়ক্রমে কৃষকদের মধ্যে এসব সার বিতরণ করা হবে। সার নিয়ে তাঁদের চিন্তার কোনো কারণ নেই।”

তবে কৃষকদের দাবি, গুদামে পর্যাপ্ত সার মজুত থাকলে তা দ্রুত তাঁদের কাছে পৌঁছানোর কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় ভুট্টা ও মরিচের আবাদে সময়মতো সার প্রয়োগ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন ও কৃষকের আয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

Popular Post

গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কর্মী সমাবেশ অনুষ্ঠিত

error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত!!

ভুট্টা-মরিচ আবাদের মৌসুমে সারসংকট, ৫ বিঘার বদলে ২ বিঘায় চাষ, দুশ্চিন্তায় চরাঞ্চলের কৃষক

আপডেট সময়: ০২:২৩:০৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

ভুট্টা ও মরিচ চাষের মৌসুম শুরু হতেই গাইবান্ধার চরাঞ্চলে দেখা দিয়েছে সারের সংকট। দীর্ঘ নদীপথ পাড়ি দিয়ে সার ডিলারের কাছে গিয়েও চাহিদা অনুযায়ী সার পাচ্ছেন না কৃষকরা। চরাঞ্চলে খুচরা সার বিক্রির কেন্দ্র চালু করা হলেও সংকটের সমাধান হয়নি বলে অভিযোগ তাঁদের। সময়মতো সার না পেয়ে ভুট্টা ও মরিচের আবাদ নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। তাঁদের আশঙ্কা, সময়মতো জমিতে সার প্রয়োগ করতে না পারলে ফসলের বৃদ্ধি ও উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে।

প্রতিবছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করে কৃষির মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির স্বপ্ন দেখেন গাইবান্ধার চরাঞ্চলের কৃষকরা। রবি মৌসুমে এসব চরে ভুট্টা, মরিচসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ করেন তাঁরা। এ বছরও ভুট্টা ও মরিচ চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। তবে মৌসুমের শুরুতেই সারের সংকট দেখা দেওয়ায় তাঁদের সেই ব্যস্ততার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাড়তি দুশ্চিন্তা।

কৃষকদের অভিযোগ, ডিলারদের কাছে চাহিদা অনুযায়ী সার পাওয়া যাচ্ছে না। চরাঞ্চলের কৃষকদের কাছে দ্রুত সার পৌঁছে দিতে কৃষি বিভাগ সাব-ডিলার নিয়োগ করলেও প্রয়োজনীয় সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ফলে অনেক কৃষক জমি প্রস্তুত করেও সারের অপেক্ষায় রয়েছেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, গাইবান্ধার বিভিন্ন চরাঞ্চলে কেউ ভুট্টা ও মরিচ চাষের জন্য জমি প্রস্তুত করছেন, আবার কেউ ইতোমধ্যে চাষাবাদ শুরু করেছেন। অনেকে জমি তৈরি করে সার সংগ্রহের অপেক্ষায় রয়েছেন। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পরপরই যেসব জমিতে ভুট্টা লাগানো হয়েছে, সেসব জমিতে সবুজ চারাগাছ বাতাসে দুলছে। কৃষক-কৃষাণিদের এখন দম ফেলার সময় নেই। তবে সারের সংকট তাঁদের কৃষিকাজে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কৃষকদের দাবি, ভুট্টা ও মরিচ চাষের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রয়োজনীয় সার না পাওয়ায় উৎপাদন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। চরাঞ্চল থেকে ডিলারের বিক্রয়কেন্দ্রে গিয়ে সার সংগ্রহ করতে অতিরিক্ত সময় ও পরিবহন খরচ বাবদ তিন থেকে চারশ টাকা বেশি ব্যয় হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনের তুলনায় কম সার পাওয়ায় বাধ্য হয়ে অন্য জায়গা থেকে বেশি দামে সার সংগ্রহের চেষ্টা করছেন তাঁরা। এ পরিস্থিতিতে কৃষকদের ভোগান্তি কমাতে খোলাবাজারে সার বিক্রির ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

গাইবান্ধা জেলার ফুলছড়ি উপজেলার চর কাবিলপুর রেজাউল নিয়ে জানান যেখানে আমি ৫ বিঘা আবাদ করতাম সেখানে সার সংকট কারণে আবাদ করতেছি ২ বিঘা।

ফুলছড়ি উপজেলার ফজলুপুর ইউনিয়নের উজলডাঙা গ্রামের কৃষক আল আমিন বলেন, ভুট্টা চাষের ভরা মৌসুমে ইউরিয়া সার পাচ্ছি না। ডিলারের কাছে গেলে সামান্য পরিমাণ সার দেওয়া হচ্ছে। তা দিয়ে জমির চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। বাধ্য হয়ে অন্য জায়গা থেকে বস্তাপ্রতি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি দিয়ে সার সংগ্রহ করে জমিতে দিতে হচ্ছে।

ফুলছড়ির গুপ্তমনির চরের কৃষক সবুজ মিয়া বলেন, জমিতে ভুট্টা লাগাচ্ছি। এ বছর সারের যে সংকট, তাতে ভুট্টার ফলন নিয়ে চিন্তায় আছি। ডিলারের পাশাপাশি খোলাবাজারে সার বিক্রির ব্যবস্থা করা হলে কৃষকদের সুবিধা হতো।

আরেক কৃষক সামাদ মিয়া বলেন, “সারের জন্য ডিলারের কাছে গেলে বিএএসের কাছে যেতে বলে। আবার বিএএসের কাছে গেলে কৃষি কর্মকর্তার কাছে যেতে বলে। এভাবে সারের জন্য হয়রানির শিকার হচ্ছি। জমিতে পানি দিয়েছি, এখন সার নেই। সঠিক সময়ে সার দিতে না পারলে ভুট্টার গাছ লাল হয়ে মারা যেতে পারে। এতে আমাদের বড় ধরনের ক্ষতি হবে।”

এরেন্ডাবাড়ীর কৃষক আবু হাসনাত বলেন, “আমি ৩৫ বিঘা জমিতে ভুট্টা চাষ করছি। জমিতে পানি দেওয়া ও নিড়ানি দেওয়ার পর সার প্রয়োগ করতে হবে। কিন্তু প্রয়োজনীয় সার পাচ্ছি না। ডিলার মাত্র দুই বস্তা সার দিয়েছেন। এই সামান্য সার দিয়ে এত জমির চাহিদা পূরণ হবে না। কষ্ট করে আবাদ করছি, সারের অভাবে তা নষ্ট হতে দিতে চাই না। তাই বেশি দাম দিয়ে হলেও অন্য জায়গা থেকে সার সংগ্রহের চেষ্টা করছি।”

মোল্লার চরের কৃষক ময়নুল প্রামাণিক বলেন, “চরের মানুষের এখন আবাদ করার ভরা মৌসুম। আমাদের পর্যাপ্ত সার দরকার, কিন্তু সার পাচ্ছি না। আমরা ডিলার, মিলার নাকি কৃষি কর্মকর্তার কাছে যাব, তা বুঝতে পারছি না। বেশি দাম দিয়ে হলেও যেন দোকান থেকে সার কেনার ব্যবস্থা করে দেয় সরকার। আবাদ না হলে আমরা বাঁচব কীভাবে।

সুন্দরগঞ্জের লাল চামার চরের কৃষক আইজার আলী বলেন, ভুট্টা আবাদে পর্যাপ্ত ইউরিয়া সার প্রয়োজন। কিন্তু প্রয়োজন অনুযায়ী সার পাচ্ছি না। সার না পেলে আবাদ করব কীভাবে? আমাদের সংসার চলে কৃষিকাজের ওপর। খোলাবাজারে সার বিক্রির ব্যবস্থা থাকলে কৃষকদের এত হয়রানির শিকার হতে হতো না।”

এ বিষয়ে ফুলছড়ির পুরাতন ফুলছড়ি এলাকার বিসিআই অনুমোদিত রাসায়নিক সার ডিলার মো. মিজানুর রহমান বলেন, “সরকারিভাবে মাসে যে পরিমাণ সার বরাদ্দ পাই, তা কৃষকদের মধ্যে বিক্রি করি। সার শেষ হয়ে গেলে চাইলেও আর দেওয়া সম্ভব হয় না। চরাঞ্চলের ভুট্টাচাষিদের একই সময়ে সারের চাহিদা থাকায় এ সমস্যা তৈরি হচ্ছে। আমরা মাসে যতটুকু বরাদ্দ পাই, ততটুকুই কৃষকদের কাছে বিক্রি করি।

স্থানীয়দের কাছে গাইবান্ধার চরাঞ্চল পরিচিত ‘হিট অ্যান্ড ডায়মন্ড’ হিসেবে। একসময় এসব জমির অনেকটাই পতিত পড়ে থাকত। এখন রবি মৌসুমে এসব জমিতে উৎপাদিত ভুট্টা স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। ভুট্টা ও মরিচসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ চরাঞ্চলের কৃষকদের জীবিকার অন্যতম উৎস।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে গাইবান্ধা জেলার ছোট-বড় ১৬৫টি চরেসহ জেলায় মোট ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে ভুট্টা চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং ১ হাজার ৯শ ৫৬ হেক্টর জমিতে মরিচ চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ।

গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক মো. আসাদুজ্জামান বলেন, “প্রতিবছর নভেম্বরের দিকে চরাঞ্চলে ভুট্টা চাষ শুরু হয়। এ বছর আগাম বন্যার কারণে অক্টোবরের শুরুতেই কৃষকরা ভুট্টা লাগানো শুরু করেছেন। এ ছাড়া কৃষকরা চাহিদার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি সার আগাম সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। তবে গুদামে পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে। পর্যায়ক্রমে কৃষকদের মধ্যে এসব সার বিতরণ করা হবে। সার নিয়ে তাঁদের চিন্তার কোনো কারণ নেই।”

তবে কৃষকদের দাবি, গুদামে পর্যাপ্ত সার মজুত থাকলে তা দ্রুত তাঁদের কাছে পৌঁছানোর কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় ভুট্টা ও মরিচের আবাদে সময়মতো সার প্রয়োগ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন ও কৃষকের আয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।