বার্ধক্য আর শারীরিক নানা জটিলতায় অসুস্থ থাকার পর গতকাল বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) সন্ধ্যায় নিজ বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন গাইবান্ধার নারী মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনা রাজকুমারী রবিদাস ফুলমতি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েও সাহস ও আত্মমর্যাদার সঙ্গে জীবন কাটিয়েছেন ফুলমতি। স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪৫ বছর পর ২০১৬ সালে নারী মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনা হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পান তিনি।
এরপর ২০১৭ সালে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে সাদুল্লাপুর উপজেলা শহরের ভূমি অফিসের সামনে সড়কের পাশে সরকারি খাসজমিতে তার জন্য চার কক্ষবিশিষ্ট একটি ‘বীর নিবাস’ নির্মাণ করা হয়। জীবনের শেষ সময়ে সেই বাড়িতেই শয্যাশায়ী ছিলেন ফুলমতি। তার স্বামী কুশিরাম সরকার ফসিয়া ১৯৮৮ সালে মারা যান। স্বামীকে হারানোর পর পাঁচ ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে একাই সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন তিনি।
স্বজনরা জানান, সাদুল্লাপুর উপজেলা সদরের উত্তরপাড়া গ্রামের ফুলমতি দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন। এর মধ্যে প্যারালাইসিস, ব্রেন স্ট্রোকসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় তার চলাফেরার সক্ষমতা কমে যায়। শেষ দিকে তিনি প্রায় পুরোপুরি শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। শারীরিক অবস্থার ক্রমাগত অবনতি হলে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তিনি মারা যান।
ফুলমতির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন তার ছেলে মনিরাজ কুমার। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে মায়ের শারীরিক অবস্থা ভালো ছিলো না। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ ও স্যালাইন দেওয়া হচ্ছিল। ধীরে ধীরে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়।
ফুলমতির মৃত্যুতে সাদুল্লাপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রশিদ আজমী শোক প্রকাশ করে বলেন, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধে ফুলমতির আত্মত্যাগ ও নির্যাতনের ইতিহাস অত্যন্ত বেদনাদায়ক। স্বাধীনতার পর দীর্ঘদিন তিনি স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত ছিলেন। অনেক চেষ্টা ও আবেদনের পর ২০১৬ সালে তার স্বীকৃতি মেলে।’
তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা ফুলমতিকে সাদুল্লাপুরের উত্তরপাড়ার নিজ বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায়। সেখানে তার ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। তখন তার বয়স ছিল আনুমানিক ২৫ থেকে ২৭ বছর।
তিনি আরও বলেন, ‘শেষ জীবনে ফুলমতি নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী ছিলেন। তার চিকিৎসার বিষয়ে সরকারি পর্যায়ে আরও সহযোগিতা প্রয়োজন ছিল। তবে তিনি কিংবা তার পরিবারের সদস্যরা কারও কাছে সাহায্যের জন্য হাত পাতেননি। শেষ দিন পর্যন্ত আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেছেন এই সংগ্রামী নারী। উন্নত চিকিৎসার সুযোগ পেলে হয়তো তিনি আরও কিছুদিন বেঁচে থাকতেন। তার মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত।’
পরিবার সূত্রে জানা যায়, অভাব-অনটনের সংসারে বড় ছেলে রতন কুমার ও নিরঞ্জন কুমার কখনও জুতা সেলাই, কখনও দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালিয়েছেন। ছেলে সুজন কুমার সরকারি দফতরে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। আরেক ছেলে মনিরাজ কুমার ২০১৭ সালে রংপুরের কারমাইকেল কলেজ থেকে মাস্টার্স পাস করেন। বর্তমানে বাড়ির সামনে কম্পিউটারের মাধ্যমে ভূমিসেবা ও অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন কাজ করেন। ফুলমতির ছেলে রতন কুমার এখনও জুতা সেলাইয়ের সঙ্গে যুক্ত। স্ত্রী, দুই ছেলে ও কলেজপড়ুয়া এক মেয়েকে নিয়ে তার সংসার।
এদিকে ফুলমতির মৃত্যুতে সাদুল্লাপুর উপজেলা ও জেলার মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মী, সাংবাদিক, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ শোক জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ফুলমতি শুধু একজন নারী নন, তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত ইতিহাস। তার জীবনের নির্যাতন, সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও আত্মমর্যাদার ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা প্রয়োজন। তার স্মৃতি সংরক্ষণে সমাধিস্থলে একটি স্মৃতিফলক বা স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
শুক্রবার বিকাল ৩টায় নিজ বাড়িতে ফুলমতির শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা লাল-সবুজের পতাকায় শেষ বিদায় জানানো হয়। তবে, বীরাঙ্গনা ফুলমতির আত্মত্যাগ, নির্যাতন ও সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে থাকবে।
রিপোর্টারের নাম 













