শেষ সম্বল ছিল মাত্র চার শতাংশ জমি। অভিযোগ, সেই জমিটুকুও কৌশলে লিখে নিয়েছেন নাতি। এরপর থেকেই মাথা গোঁজার ঠাঁই নিয়েও অনিশ্চয়তায় পড়েন ৯০ বছরের আজিজুল রহমান ও তার ৮০ বছরের স্ত্রী মাজেদা বেগম। অসুস্থ স্বামী হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছেন, আর পাশে বসে সেবা করছেন বৃদ্ধ স্ত্রী এমন হৃদয়স্পর্শী দৃশ্য উঠে আসে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনগুলো প্রচারের পর বিষয়টি নজরে আসে স্থানীয় প্রশাসনের। অবশেষে অসহায় এই বৃদ্ধ দম্পতির পাশে দাঁড়িয়েছে প্রশাসন।
মঙ্গলবার (৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে গাইবান্ধা সদর উপজেলার বল্লমঝাড় ইউনিয়নের মোড়লপাড়ায় আজিজুল রহমান ও মাজেদা বেগমের বাড়িতে যান গাইবান্ধা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সবুজ কুমার বসাক।

গাইবান্ধা জেলা প্রশাসকের নির্দেশে তিনি বৃদ্ধ দম্পতির জন্য চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী নিয়ে যান। পাশাপাশি আজিজুল রহমানের চিকিৎসার জন্য ওষুধ কেনার বাবদ নগদ ১৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়। প্রশাসনের এ সহায়তায় কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে বৃদ্ধ দম্পতির জীবনে। তবে তাদের কষ্টের গল্প কয়েক দিনের নয়।
বল্লমঝাড় ইউনিয়নের মোড়লপাড়ার বাসিন্দা আজিজুল রহমান একসময় দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালাতেন। বয়সের ভারে এখন আর কাজ করার সামর্থ্য নেই। আধাভাঙা টিনের ঘরে স্ত্রীকে নিয়ে কোনো রকমে দিন কাটছে তাদের।
দুই মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে এই দম্পতির। ছেলে ময়নুল রিকশা চালিয়ে নিজের সংসার চালান। তবে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের তেমন খোঁজখবর রাখেন না বলে অভিযোগ। এক মেয়ে স্বামী পরিত্যক্তা। তিনি অন্যের বাড়িতে কাজ করে নিজের সংসার চালানোর পাশাপাশি যতটা সম্ভব বাবা-মায়ের দেখভাল করেন।
বৃদ্ধ আজিজুল রহমানের শেষ সম্বল ছিল চার শতাংশ বসতভিটার জমি। অভিযোগ, সেই জমিটুকুও তার নাতি নিশান কৌশলে লিখে নিয়েছেন। জমি হারানোর পর থেকেই নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন বৃদ্ধ দম্পতি।
এর মধ্যেই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন আজিজুল রহমান। তাকে হাসপাতালে নেওয়ার মতো সামর্থ্য কিংবা পাশে থাকার মতো কাউকে না পেয়ে বিপাকে পড়েন স্ত্রী মাজেদা বেগম। শেষ পর্যন্ত কোনো রকমে স্বামীকে নিয়ে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালের গেটে পৌঁছান তিনি। সেখানে স্বামীর চিকিৎসার জন্য মানুষের কাছে সাহায্য চাইতে থাকেন।
বিষয়টি নজরে আসে সোহেল রানা নামের এক যুবকের। বৃদ্ধার অসহায়ত্বের কথা জানতে পেরে তিনি নিজের উদ্যোগে আজিজুল রহমানকে হাসপাতালে ভর্তি করান। গাইবান্ধা জেলা ছাত্রদলের যুগ্ন আহবায়ক রিমন ব্যবস্থা করেন জরুরি চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ওষুধের।
পরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত হয় বৃদ্ধ দম্পতির মানবেতর জীবনযাপনের প্রতিবেদন। প্রতিবেদনগুলো প্রচারের পর বিষয়টি জেলা প্রশাসনের নজরে আসে। জেলা প্রশাসকের নির্দেশে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাদের বাড়িতে গিয়ে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন।
তাৎক্ষণিক খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা পেলেও পুরোপুরি দুশ্চিন্তামুক্ত হতে পারেননি আজিজুল রহমান ও মাজেদা বেগম। কারণ, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাদের প্রয়োজন শুধু কয়েক দিনের খাবার কিংবা একবারের চিকিৎসা নয়। প্রয়োজন নিয়মিত চিকিৎসা, নিরাপদে বসবাসের নিশ্চয়তা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং আপনজনের একটু মমতা।
স্থানীয়দের মতে, এই বৃদ্ধ দম্পতির জন্য নিয়মিত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে তাদের জীবন আরও কিছুটা নিরাপদ ও স্বস্তির হবে।
বয়সের ভারে যখন মানুষ কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন, তখন রাষ্ট্র ও সমাজের সহায়তাই হয়ে ওঠে তাদের বড় ভরসা। এখন বৃদ্ধ দম্পতির প্রত্যাশা জীবনের শেষ দিনগুলো যেন অনিশ্চয়তা ও অবহেলায় না কাটে। চিকিৎসা, খাবার, নিরাপদ আশ্রয় আর মানুষের ভালোবাসায় যেন বাকি জীবনটা কাটাতে পারেন তারা।
রিপোর্টারের নাম 














